Tuesday, March 3, 2020

পাঠ প্রতিক্রিয়া: আমাদের পদক্ষেপ, ২০২০ বইমেলা সংখ্যা - দীপক আঢ্য


পাঠ প্রতিক্রিয়া: আমাদের পদক্ষেপ // দীপক আঢ্য

চার ফর্মার প্রথম বর্ষের প্রথম সংখ্যা আমাদের পদক্ষেপহাতে পেয়ে অতি উৎসাহে পাঠ শেষ করার পর খুব যে আহ্লাদিত হলাম, তেমন না হলেও ভালো লাগার রেশ এখনও বর্তমান। পত্রিকার শুরুতেই প্রখ্যাত সাহিত্যিক শ্রী অজিতেশ নাগের অতি দীর্ঘ সাক্ষাৎকার (পত্রিকার প্রায় এক-চতুর্থাংশ জুড়ে) সুপাঠ্য সন্দেহ নেই। কিন্তু প্রায় ব্যক্তিগত আলাপচারিতা পত্রিকার শ্রী-বৃদ্ধিতে কি সত্যিই সাহায্য করল, এই বিষয়ে পত্রিকার সম্পাদকের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি মাত্র। কবিতা বিভাগের শুরুতেই সুজন ভট্টাচার্যের কবিতা (এই শিরোনামেই) মনে করিয়ে দিল একটা সময় বিশেষ রে বাংলা সিনেমার ক্ষেত্রে সত্যজিৎ রায়ের সিনেমাএই ক্যাপশনে বড় বড় পোস্টার সাঁটা হতো। রায় মহাশয়ের সিনেমা একটা ভিন্নতর স্বাদ যোগাতো দর্শককে। তাই সে সময় তাঁর ওই স্ব-ঘোষিত বিজ্ঞাপনে কখনোই বিচলিত হয়নি দর্শককুল। কিন্তু এখানে সুজন বাবুর আপাত নামহীন কবিতায় সেই ভিন্নতর আস্বাদ পেলাম কোথায়? (যদিও কবিতার শিরোনাম থাকতেই হবে, সে বাধ্যতা নেই কোথাও)  কবি আর্যতীর্থর আসামীকবিতার বিষয় মন কাড়লেও কবিতাটি কবিতা হয়ে ওঠার থেকে কিঞ্চিৎ সরে গিয়েছে বলেই মনে হলো। একই কথা তমোঘ্ন চট্টোপাধ্যায়েরধন্যবাদকবিতার ক্ষেত্রেও। এতো ইলাবোরেশনের কি সত্যিই দরকার ছিল? পাঠককে কবি ভাবতে দিলেন কই? ভাল লেগেছে স্বদেশ রঞ্জন মণ্ডলের কবিতা দ্বিখণ্ডিত রাজকুমার ঘোষের সনেটটিতে সনেটের শর্তাবলী বজায় থাকলেও কবিতার ঘ্রাণ একটু হলেও শুকিয়ে গিয়েছে ছন্দে। কিছু ছাই কিছু মাটিকবিতায় কবি অমিতাভ দাসেরখুনএবং ভ্রূণশব্দদুটিকে জোর রে অন্ত্যমিল করার যে প্রচেষ্টা তা (ফোনেটিক্যালি) বড়ই শিথিল।
জিরো বাউন্ডারির ভবিষ্যৎপ্রবন্ধে , “কারো সমালোচনা না করেই বলছি, হাংরি আন্দোলনের ক্ষেত্রে মাত্র দশ পনেরো পাতার ইস্তেহার লিখে কীরকম আলোড়ন তৈরি হয়েছিল। একটা মিথ পর্যায় পর্যন্ত গড়িয়ে গেল। আর আমি ২০০০০ শব্দ লিখলাম। তুলনা করলাম না। উল্লেখ করলাম মাত্র।কথাগুলো না লেখা হলেই মনে হয় অধিক ভাল হতো। কবিতার জগতে কম ইসমবা বাদআসেনি। সময়ের কষ্টি পাথরে তাদের বিচার হয়েছে বা হবেও। এতো তাড়া কিসের? তাছাড়া এটাও ভেবে দেখার আছে, সত্যিই জিরো বাউন্ডারিএই ভাবনাটাকি একদমই নতুন স্বতন্ত্র? নাকি এই শব্দবন্ধটুকু ঘুরে ফিরে এসেছে কবিতার দোরগোড়ায়। প্রসঙ্গক্রমে একটা পুরনো কথার রেশ। কবীর সুমন বা নচিকেতা তাদের জীবনমুখী গানের ডালি নিয়ে যখন বাংলা গানের নতুন জোয়ার আনেন, তখনও কিন্তু এই কথাটাই শুনতে হয়েছিল, এঁদের গান জীবনমুখী হলে, ভূপেন হাজারিকার’ ‘মানুষ মানুষের জন্যে...এই ধরণের গানগুলোকে কি তাহলে মরণমুখী বলতে হবে?
 
অপর একটা প্রবন্ধ মিল, ঘাড়ে যখন হাতি’-তে নতুন বিশেষ কোনও তথ্য খুঁজে পেলাম না। পরের কবিতা গুচ্ছে অনেকগুলো কবিতা ভালো লাগাকে অতিক্রম রে গিয়েছে তা বলাই বাহুল্য। প্রার্থিতকবিতায় দেবযানী গাঙ্গুলীর প্রথম লাইন, ‘দেবে যদি একান্ত কিছুই তবে কথা দিওকিছু পাঠকের অবসরে অনুরণন জাগাবে তাতে সন্দেহ নেই। ভালো লেগেছে প্রসেনজিৎ মণ্ডলের হাওয়ায় ভাসছে পালককিংবা কৌশিক দে বা মানবেশ মিদ্দার কবিতাও। ভালো লেগেছে রবীন বসু , রবীন পার্থ মণ্ডলের কবিতাও।
 
ভালো প্রচেষ্টা আমার চোখে তোমার কবিতাবিভাগটি। তবেঅণুকবিতাবিভাগটি সত্যিই কতটা অণুহয়ে উঠেছে বা আদৌ হয়েছে কিনা তা নিয়ে আলোচনা করা যেতেই পারে।

Sunday, March 1, 2020

#পদক্ষেপ_পত্রিকা_চুঁচুড়া_অমর_১৯_পাঠ_প্রতিক্রিয়া - অজিতেশ নাগ



পদক্ষেপ পত্রিকা চুঁচুড়া নভেম্বর ২০১৯। শেষ করতে এতদিন লাগার কথা নয়। আসলে এক আত্মীয় পড়তে নিয়ে আর ফেরত দিলো না। শুধু তাই নয়, সে সোজা মাদারিহাট চলে গেলো। মহান ব্যক্তি। যাকগে, নির্মলেন্দু জানতে পেরে রাজকুমারের হাত দিয়ে আরেক কপি পাঠিয়ে দিলো। এবারে শান্তি করে পড়লাম। সবচেয়ে আকর্ষণীয় লেগেছে প্রবন্ধগুলো। রীতিমত গবেষণামূলক। ভাষা আন্দোলন নিয়ে অনেকটা পড়া থাকলেও আরও জানতে পেরে ঋদ্ধ হলাম। আশিষ রঞ্জন, দিলীপকান্তি এবং অরুণিমা – তিনজনকেই প্রচণ্ড অধ্যবসায় নিয়ে এগোতে হয়েছে বুঝতেই পারলাম। সুশান্ত করের অনুবাদ মোক্ষম। নিবন্ধে কুনালকান্তি এবং রমলাদেবী দুর্দান্ত! এ বাদেও এই সংখ্যায় বেশ কিছু কবিতা আছে, আছে গল্পও। অধিকাংশ সাহিত্যিকের লেখার সাথে পূর্ব-পরিচিত আছি বলে পড়তে আরও মজা লাগলো। অধিকাংশ লেখকের মুন্দিয়ানা অবাক করেছে আমাকে। ভাষা আন্দোলন এবং অসমীয়া মানুষজনদের ঘিরে অভিজিৎ দত্ত-এর ব্যক্তিগত স্মৃতিচারণ পড়তে পড়তে চোখে জল চলে এলো। লেখাটির নামটা আরেকবার পড়লাম – ‘সূর্য যখন অন্ধকারে’। কোন অন্ধকারে চলে যায় মানুষ, কে বলতে পারে! শুধু তার সৃষ্টি থেকে যায়। সবশেষে অচিন্ত্য সুরালের সাক্ষাৎকার খুব ভালো লেগেছে। এর জন্য একটা ধন্যবাদ পার্থবাবুর প্রাপ্য।
সব মিলিয়ে ১৯ মে’র ভাষা-অগ্নুৎপাত নিয়ে সমগ্র সংখ্যাটি প্রকাশ করে নির্মলেন্দু একটা কাজের কাজ করেছে। সংখ্যাটি রীতিমত সংগ্রহে রাখবার মত। আসলে প্রতিটি সবুজপত্রের একটা অভিমুখ থাকা নিতান্ত দরকার। শুধুমাত্র ছাপবো বলে ছাপছি – নয়, কেন ছাপছি – এই বোধটাও সম্পাদকের থাকা দরকার। নির্মলেন্দু’র আছে। এই সংখ্যার সাথে যুক্ত সকল মানুষ, যেমন রাজকুমার, অর্চক, বৈশাখী, সুব্রত প্রমুখদের আমার পরম শুভেচ্ছা। প্রচ্ছদ সমীরণের করা। খুব ভালো হয়েছে। পদক্ষেপ পত্রিকা চুঁচুড়া’র জন্য অনেক শুভেচ্ছা রইল আমার।

আমাদের পদক্ষেপ পত্রিকার বইমেলা ২০২০ সংখ্যার পাঠ-প্রতিক্রিয়া - সঙ্কর্ষণ ঘোষ...


#পাঠ_প্রতিক্রিয়া
আমাদের পদক্ষেপ (প্রথম সংখ্যা)
সম্পাদনা- নির্মলেন্দু কুণ্ডু
প্রকাশনা- আমাদের পদক্ষেপ পরিবার, মূল্য- ৫০/-

গতবারের পুজোর কিছুদিন আগে বসিরহাটে একটি পত্রিকা প্রকাশের অনুষ্ঠানে সম্পাদকের আমন্ত্রণে উপস্থিত ছিলাম। কলকাতা শহর থেকে অতো দূরে আগে যাইনি কখনও। স্টেশন থেকে একটু ভেতরে একটি বিদ্যালয়ের মঞ্চে একত্রে প্রায় ৮-১০টি পত্রিকা প্রকাশিত হ'চ্ছিলো। আমার নিজের যেখানে লেখা বেরিয়েছিলো সেই পত্রিকা কর্তৃপক্ষ আমায় আগেই জানিয়েছিলো সৌজন্য সংখ্যা দিতে তাদের আদৌ অসুবিধা নেই, কিন্তু ২০/- দামের পত্রিকা বিনামূল্যে কিনে নিতে বিবেক বাধা দেওয়ায় আমি সেটি দাম দিয়েই কিনে নিই। তখন গ্রন্থ-আলোচক হিসাবে সামান্য পরিচয় তৈরী হওয়ায় বেশ কিছু সম্পাদক স্বেচ্ছায় তাঁদের পত্রিকাগুলি আমার হাতে তুলে দেন আর আমার প্রতিক্রিয়া পেতে অপেক্ষায় থাকলেন ব'লে জানান। সেই প্রার্থনা এখনও অবধি মঞ্জুর ক'রতে না পারায় আমি তাঁদের কাছে আন্তরিকভাবে ক্ষমাপ্রার্থী। ট্রেনে আসতে আসতে পত্রিকাগুলি প'ড়ছিলাম এবং সত্যি ব'লতে কী বেশ কিছু বিষয় রীতিমতো বিস্ময়ের উদ্রেক ক'রছিলো। মূলতঃ দ্রষ্টব্য ১। কলমগুলি সম্পূর্ণ অপরিচিত অথচ বীভৎস শক্তিশালী, ২। সম্পাদনা বিভীষণ রকম বলিষ্ঠ, ৩। সবকটিই মূলতঃ ক্রোড়পত্র গোছের, ৪। সবকটিরই বিনিময় মূল্য ৫০/-র আশেপাশে। আলোচক হিসাবে আমার কর্তব্য ছিলো আদর্শ পত্রিকার উদাহরণরূপে এগুলিকে সকলের সামনে নিয়ে আসা, পড়াশোনার ব্যস্ততা তার সুযোগ সেভাবে দেয়নি আমায়। তবে এই পত্রিকাগুলি আমায় একটি বিষয় নিঃসন্দেহে ভাবতে বাধ্য ক'রেছিলো, যে বাংলা সাহিত্যের হৃদস্পন্দনকে শুনতে চাইলে মাটির কাছে যেতে হবে আর মাটি যদি ছুঁতে চাও, শহরের বাইরে তাকাও। বসিরহাটের ঋণ চুঁচুড়ায় কতোখানি শোধ হওয়া সম্ভব তার উত্তর জানতেই 'আমাদের এহেন পদক্ষেপ' নেওয়া, মাটিকে ছোঁয়ার সুখানুভূতিটুকু ত্যাগ ক'রতে আমি কদাপি রাজি নই কিনা। তবে আসুন, শুরু করা যাক।
প্রকাশিত একটি মাত্র সাক্ষাৎকার সম্পর্কে ব'লি, এই অংশটিতে বেশ কিছু অভিযোগের অবকাশ থাকলেও সামগ্রিক বিচারে এটিই পত্রিকার সর্বোত্তম বিভাগ হিসাবে নিজেকে প্রতিভাত ক'রেছে। এটি ভালো লাগার অন্যতম কারণ হ'লো, ভদ্রলোকের বক্তৃতা আমি মঞ্চে দুয়েকবার শুনেছি এবং বক্তৃতা শুনে সাহিত্য সম্পর্কে জনৈক প্রতিষ্ঠিত সাহিত্যিকের দৃষ্টিভঙ্গী তেমনভাবে বোঝা না গেলেও সম্পাদকের সাক্ষাতে তিনি নিজেকে অনবদ্য প্রকাশ ক'রেছেন। আবার ঠিক এইখানে পাঠকও পত্রিকার কাছে অভিযোগ ক'রতেই পারেন, ছোটো পত্রিকা ও সংগঠন সম্পর্কে আলোচনার জন্য একজন লেখককে যতোখানি পরিসর দেওয়া হ'য়েছে সাহিত্য সম্পর্কেও তাঁকে ততোখানি দেওয়া যেতোনা কি? এ ক্ষেত্রে উত্তরদাতা নন, স্বয়ং প্রশ্নকর্তার উচিত ছিলো আলোচনার অভিমুখ সঠিক রাখা। তবুও ছোটো পত্রিকা সম্পর্কে লেখক যে তাঁর মতটুকু স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন, তাতেই পাঠকের চিন্তার যথেষ্ট অবকাশ র'য়েছে। বক্তব্যের বৈপরীত্যের পরিসর এখানে নয় আর হ্যাঁ জনৈক যেকোনো ক্ষেত্রে যতো অভিজ্ঞই হ'ননা কেন, ১৫টি পাতা... যার অন্ততঃ ৪টি ঢক্কানিনাদ (অসত্য আমার স্বভাববিরূদ্ধ) পত্রিকা-ব্যবস্থাপনার ব্যয়ভার ব্যতীত সম্মান বৃদ্ধি করেনা।
এইবারে শুরু হয় এই সংখ্যার যা মূল প্রতিপাদ্য, কবিতা (প্রথমাংশ)। আগেই ব'লে রাখি, গোটা বইটির বিশেষত্বই এই, যে এখানে 'অসাধারণ' কবিতা ব'লে কিছু নেই। যা আছে উচ্চ-মধ্যম ও নিম্ন-মধ্যম মানের কবিতা। এই অংশটিতে মূলতঃ এই উচ্চ-মধ্যম মানের কবিতাগুলি স্থান পেয়েছে এবং যেটি লক্ষ্যণীয় এবং সম্পাদনায় দৌর্বল্যের একটি প্রকটতম বিষয় তা হ'লো যাঁদের লেখা এখানে রাখা হ'য়েছে গণমাধ্যমের সাহিত্য পরিসরে এঁরা পাঠকের তো বটেই, পরস্পরেরও যথেষ্ট পরিচিত। কবিতার পত্রিকা যদি নতুন কলমের সাথেই পাঠকের পরিচয় করাতে না পারে পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ তো উঠবেই, উপরন্তু উপদেষ্টা মণ্ডলীর ৪জনের লেখা সর্বাগ্রে থাকা এবং তাঁদের পরিচিত বৃত্তের উপস্থিতি কিন্তু পত্রিকার চিরকালীন উদ্দেশ্যকে খর্ব ক'রবে। অনেকে প্রশ্ন তুলতেই পারেন, যে এখানে তো তাঁদের লেখা বেরিয়েছে 'কবি' হিসাবে, উপদেষ্টা তো নন... তাঁদের ব'লি পত্রিকা আয়তনে ছোটো হওয়ার কারণে আদর্শ পাঠকের প্রতিটি অক্ষর খুঁটিয়ে পড়ার মানসিকতা এমনিই বাড়বে এবং কোনো নতুন কলম যদি একবার এই জিনিস ধ'রে ফেলে সম্পাদকের উদ্দেশ্য সৎ হোক আর না হোক, তারা আগামীদিনে আর কোনো লেখাই দেবেনা। বলিষ্ঠ যে সে স্বজনপোষণের অভিযোগে বিজ্ঞপ্তি নস্যাৎ ক'রবে আর যে লেখা পাঠাতে ভয় পায় সে আগেই ধ'রে নেবে সৃষ্টি গৃহীত হবেনা। কবিতাগুলির বিষয়বস্তু কোনোটিরই খুব খারাপ না, তবে আগেও ব'লেছি ছন্দে কবিতা লেখা বা কেবল অন্ত্যঃমিল কিন্তু নিয়মিত অভ্যাসের দ্বারা আয়ত্ত একটি শৈলী, মিল আর গোঁজামিলের মধ্যে যথেষ্ট পার্থক্য বর্তমান। তাই যেমন তেমন ক'রে প্রকাশদোষে দুষ্ট একটি লেখা এবং একটি দেখনদারির নিষ্ফল প্রয়াস ব্যতীত বাকি লেখাগুলিকে মোটামুটি চলনসই বলাই যায়।
কবিতা সংক্রান্ত প্রবন্ধের অংশটি সম্পর্কে বিস্তৃত আলোচনার অবকাশ ব'লতে সেদিক থেকে একগাদা অভিযোগ ছাড়া আর কিছুই করার নেই, তাতে যে কেউ আমাকে যেমনই ভাবুননা কেন। প্রথম প্রবন্ধটিতে খানিক পাণ্ডিত্য জাহির ক'রে নাকি কবিতা সম্পর্কে চিরাচরিত ধারণাকে ভাঙতে চেষ্টা করা হ'য়েছে, যদিও আমি গোটা প্রবন্ধে 'সবাই ভুল লেখক ঠিক', কিছু বিদেশী দার্শনিকের অন্তিম পর্যায়, খানিক পুরস্কারের ফিরিস্তি আর বিষোদ্গার ব্যতীত কবিতা-সংক্রান্ত আর কিছুই পাইনি। এই লেখা সম্পাদক কেন ছেপেছেন, এহেন প্রশ্ন করা অত্যন্ত অসভ্যতা, শুধু ব'লবো লেখা নির্বাচন মানে কিন্তু চেনা লোকের লেখা জড়ো ক'রে তা ছাপিয়ে দেওয়া নয়। আদর্শ পত্রিকার একটি নির্দিষ্ট বার্তা থাকে, এই অবধি এসেও আমি কিন্তু তার চিহ্ন খুব বেশী পাইনি। কিন্তু প্রথম প্রবন্ধটিকে তাও একটু এগিয়ে রাখাই যায় লেখনশৈলীবশতঃ, কিন্তু এরপর অত্যন্ত হাস্যকর ও বিরক্তি-উদ্রেককারী যে লেখাটিকে প্রবন্ধ ব'লে চালাবার চেষ্টা করা হ'য়েছে, সেটি আর যা'ই হোক, প্রবন্ধ নয়... ওটিকে অপটু হাস্যরসের মোড়কে টুকে দেওয়া ব্যাকরণ বইয়ের পৃষ্ঠা বলা যেতে পারে। ভদ্রলোক লেখাটির উপসংহার পর্যন্ত টানতে পারেননি। ওটির মূলতঃ কোনো আলোচনা হয়ই না। এই অংশটি পাঠক হিসাবে আমাকে যারপরনাই হতাশ ক'রেছে বলাই বাহুল্য।
মিথ্যা ব'লবোনা, কবিতার দ্বিতীয়াংশে এসে পত্রিকার একটি স্পষ্ট অবয়ব পাওয়া যায়। প্রথমে এই অংশের সব কবিতা কিন্তু আমার আদৌ পছন্দ হয়নি। বারংবার পড়ার পর কিছু কবিতায় গভীরতা পেলেও সেগুলির প্রকাশে এতো জটিলতা, যে সমস্যার উদ্রেক ক'রছে। এই অংশে উচ্চ ও নিম্ন-মধ্যমমানের উপস্থিতির হার সমানুপাতিক, প্রথমাংশের মতো শুধুই উচ্চ-মধ্যমের রাজত্ব নয়। এই অংশটি এই কারণেই পত্রিকার পরিচয়, যে পরিচিত বৃত্ত প্রাধান্য পেলেও একটি বিষয় পরিষ্কার যে সম্পাদক প্রেম বা রাজনৈতিক অস্থিরতার অপটু প্রকাশকে দূরে স'রিয়ে রেখে মনস্তত্ত্বের গভীরতাকে প্রাধান্য দিয়েছেন এবং তখনই আমরা প্রথমাংশে ফিরে গিয়ে দেখি যে সেখানেও তিনি এই চ'লতি হাওয়ার বিপরীতে হাঁটার ইচ্ছা প্রকাশ ক'রেছেন আর লেখকরাও কিন্তু স্বতঃস্ফূর্তভাবেই তাতে সাড়া দিয়েছেন, সে তিনি সেভাবে লেখা চেয়ে বিজ্ঞপ্তি দিন আর না দিন। কবিতার মূল উপাদান কিন্তু তার অন্তর্নিহিত বার্তাই, প্রকাশকে বরং ছাড় সামান্য হ'লেও দেওয়া যেতে পারে। সম্ভবতঃ মাঝখানের প্রবন্ধ অংশটিকেও দুটি কবিতাংশের যোগসূত্র হিসাবেই রাখা হ'য়েছিলো, যাতে পাঠক ক্লান্ত না হ'য়ে পড়েন। তৃপ্ত না হ'লেও এই অংশটি পাঠকের সুনজরে থাকবে ব'লে আশা করা যায়। তবে প্রথমটির মতোই এই অংশেও নতুন কলমের উপস্থিতি প্রায় নেই।
নির্দিষ্ট একটি কবিতার ব্যাখ্যা সংক্রান্ত আলোচনার সাথে সাক্ষাৎ ঘটেনা বিশেষ, এখানে একে গুরুত্ব পেতে দেখে আনন্দিত হ'লাম। কবিতা ও আলোচনা উভয়কেই এখানে খুঁটিয়ে দেখার অবকাশ বর্তমান। ছন্দপতন তখনই ঘ'টলো, যখন দেখলাম প্রথম কবিতাটি এককথায় অসাধারণ, কিন্তু তার ব্যাখ্যাটি এতো জঘন্য যে বলার নয়। আমি আগেও ব'লেছি, এখনও ব'লছি পাঠককে বিষয়ের ব্যাখ্যা করা আর পাঠকের সামনে নিজের ঢাক পেটানো ২টি সম্পূর্ণ আলাদা বিষয়। অসংখ্য ইংলিশ শব্দের ব্যবহারে একটি দুর্বোধ্য অনুচ্ছেদ, যার সেভাবে কোনো অর্থই নেই... জানিনা, হয়তো একটি আত্মঘাতী জাতির পক্ষেই সম্ভব এভাবে তার মাতৃভাষাকে প্রতিনিয়তঃ অপমান করা ও পাঠককে হত্যার রাস্তা খুলে দেওয়া। দ্বিতীয় কবিতার সমালোচককে ব'লি, তিনি যেন ভুলে না যান তিনি জনৈক 'লিখিয়ের' বিশ্লেষণ ক'রছেন এবং তাঁর বিশ্লেষণের ভিত্তিতেই একটি লেখা কবিতা ব'লে প্রতিপন্ন হবে। কিন্তু তিনি যদি আগেই "এই কবিতা... " দিয়ে ব্যাখ্যা আরম্ভ করেন তা কিন্তু একেবারেই কাম্য নয়। ব্যাখ্যা নেহাত খারাপ নয়, যেহেতু কবিতাটির বক্তব্য নেহাতই একমুখী এবং সরল। তৃতীয় কবিতা ও ব্যাখ্যা প্রথমটির অবস্থার হুবহু নকল... কবিতা অসাধারণ, ব্যাখ্যায় অকারণ অসহ্য দুর্বোধ্যতা। উপরন্তু ইনিও দ্বিতীয়জনের মতোই একটি লেখাকে কবিতা ঘোষণা ক'রেই তার ব্যবচ্ছেদ শুরু ক'রেছেন। কিন্তু বিন্দুমাত্র পক্ষপাতিত্ব না ক'রেই ব'লবো দ্বিতীয়জন তেমন পরীক্ষার সামনে আদৌ পড়েনইনি এবং সেজন্যই তাঁর ব্যাখ্যাটি সরল ও স্বাভাবিক। তাঁকে সাধুবাদ জানাই।
অণুকবিতার অংশটিতে মূলতঃ নিম্ন-মধ্যমমানের রচনাই স্থান পেয়েছে, যদিও মুন্সীয়ানা এতেই সর্বাধিক প্রয়োজন। দুয়েকটি বেশ ভালো লেখা থাকলেও বিজ্ঞপ্তির উত্তরে সম্পাদকের প্রচুর পরিমাণে লেখা পাওয়ার দাবি নিয়ে সন্দেহ জাগে। কারণ এই প্রথম একটি অংশে অপরিচিত কলমের সংখ্যাই বেশী এবং লেখাগুলিও তেমন ভালো নয়। তবে কবিতার এই বিভাগটিও যে সম্পাদক খেয়াল রেখেছেন, সে কারণে তাঁকে ধন্যবাদ।
কবিতার বই যখন বেরিয়েছে লিখিয়েকে কবি ব'লেই ডাকতে হবে বইকি। তবে প্রথমজন যাঁর বই আলোচনা ক'রেছেন তাঁর কবিতার সাথে তাল রেখে নিজের আলোচনাটি যথাসাধ্য মনোগ্রাহী করার চেষ্টা করেছেন এবং সে চেষ্টা মোটামুটি সফলও বটে। তবে খুব ভালো লাগলো প্রথম আলোচকের কবিতার বই নিয়ে দ্বিতীয়জনের আলোচনা। কবিতা ভালো না হ'লেও তৎসংক্রান্ত আলোচনার ভাষার এতো কোমলতা আমি দেখিনি আগে। তৃতীয় আলোচনায় একদম সঠিক কথা, যে যাঁর বই আলোচনা করা হ'য়েছে তাতে অন্তর্নিহিত বক্তব্যগুলি পরোক্ষভাবে অপর এক প্রতিষ্ঠিত কবির নকল। তবে আমি এখনও ব'লবো বই বেরোনো মানেই কিন্তু জনৈকের পরিচয় কবি নয়, সে পথ এখনও দূর, অনেক দূর।
সবশেষে ব'লি, প্রকাশিত একটি মাত্র সাক্ষাৎকার, কিছু সুপাঠ্য কবিতা ও পাঠ-প্রতিক্রিয়ার অংশটির কারণে এই সংখ্যাটি সংগ্রহে রাখলেও রাখতে পারেন। মুদ্রণের ক্ষেত্রে ওপর-নীচে দুটি বাক্যের মধ্যে ফাঁক একটু বাড়াতে হ'তো। সম্পাদকের প্রতি কয়েকটি অযাচিত পরামর্শ র'ইলো, যে বইমেলায় যে পত্রিকা প্রথমবারের মতো প্রকাশিত হ'চ্ছে তার প্রথম সংখ্যা গল্প ব্যতীত কেবল কবিতা-বিষয়ক হ'লে কিন্তু সাধারণ পাঠককে আকর্ষণ করা ভীষণই কঠিন। এছাড়াও নতুন কলমকে জায়গা দিতে এগিয়ে আসতে হবে সেই বসিরহাটের পত্রিকাগুলির মতো। যদি ভালো লেখা না আসে সময়সীমা বাড়ানো হোক। সম্পাদকীয়ও আরেকটু মনোগ্রাহী হ'তেই পারতো, কিন্তু সেটুকু এমন কিছু বড়ো ক'রে না দেখলেই হয়। আমি আমার নিজস্ব গৃহীত নিয়মানুসারে কোনো লেখা বা লেখকের নামোল্লেখ হ'তে বিরত থাকলাম, কারণ চাইবো আমার কথা থেকে যতোটুকু ধারণা পাঠক পেলেন বাকিটুকু পত্রিকাটি কিনে ক'রুন।
ধন্যবাদ।

আমাদের পদক্ষেপ পত্রিকা নিয়ে পাঠ প্রতিক্রিয়া - অর্ণব গড়াই


আমাদের পদক্ষেপ, সত্যিই এ যেন আমাদের জন্যই একটা আপাদমস্তক সবুজপত্র । প্রতিটি সংখ্যার মতো এইবারের বইমেলা সংখ্য্য ( কবিতা সংখ্যা ) স্বাদে গন্ধে অতুলনীয় । আমি পত্রিকা রিভিউ এর ব্যাপারে একেবারেই অপটু তাই এটা রিভিউ না বলে ভালোলাগা বা খারাপলাগা আলোচনা বলা যেতে পারে ।

আলোচনাই যখন করবো তখন তা ধাপে ধাপে হওয়াই শ্রেয় বলে মনে করি । প্রথমেই আসি অজিতেশদার সাথে পত্রিকার কথোপকথন প্রসঙ্গে । অজিতেশদার প্রতিটা বক্তব্যর সাথেই আমরা কমবেশি সকলেই এই পরিবারের ওয়াকিবহাল । সবুজপত্রগুলোর প্রতি ওনার ঔদার্য্য এককথায় অনস্বীকার্য্য । উনি বরাবরই পত্রিকা কিনে পড়ার উপরই জোর দেন এবং সেটা নিজেও করেন । অজিতেশদার আর একটা বক্তব্যও বেশ জোরালো, ফেসবুকে বা হোয়াটসআপে যেহুতু সম্পাদক থাকেনা তাই সেই লেখার লাইক বা কমেন্টের তারতম্য দেখে কখনই একজন লেখককে বিচার করা উচিৎ নয় । ফেসবুকে অবশ্যই বেশ কিছু ভালো লেখক বা কবি আছেন যাদের মাঝেমধ্যে ফেসবুকিয়া কবি বলতেও কেউ কেউ দ্বিধা করেন না কিন্তু বেশ কিছু কবি আছেন যারা আবোলতাবোল লিখে মুড়ি মুড়কির মতো সার্টিফিকেট বা প্রশংসাপত্র পেয়ে থাকেন ।এক্ষেত্রে আমার মতে ভালো যারা লেখেন তাদের নতুন কিছু করা সম্ভব কিনা একবার ভেবে দেখতে পারেন । যদিও আমি ব্যাক্তিগতভাবে কিছু ভালো লেখক লেখিকাদের নিয়ে একটা প্রচেষ্টা করেছিলাম কিন্তু সেভাবে সাড়া পায়নি । তার একটা অবশ্যই কারন অপরিচিতি । আর একটা কারনও অবশ্য আছে, অনেকেই নিজের লেখার সমালোচনা শুনতে চাননা । আমার মতে যারা কবিতা যাপন করেন অর্থ্যাৎ কবিতাই যাদের ধ্যানজ্ঞান তারা একটা সাধু চেষ্টা করে দেখুননা যদি কিছুজনকেউ তাদের ভুল ধরিয়ে কিছু নতুন শেখানো যায়। অনেকেই হয়তো বলবেন কবিতা আবার শেখানো যায় নাকি? আমি বলবো যায়, আমাদের মধ্যে আনেকেই আছেন যারা উদোরপিন্ডি বুধোর ঘাড়ে চাপিয়ে কিছু একটা লিখে কবিতা বলে চালিয়ে দেন । তাদের জন্য তো অন্তত একটা অনলাইন টিউটোরিয়াল গোছের কিছু ভাবাই যেতে পারে । তাহলে আর আগামীদিনে কেউ বলতে পারবেনা ফেসবুক বা হোয়াটসঅ্যাপে সম্পাদক বলে কিছু থাকেনা ।

এবার আসি কবিতার কথায়, বেশ কিছু কবিতা এককথায় অপূর্ব । ভিন্ন স্বাদের কবিতা, ভিন্ন স্বাদের লেখা উঠে এসেছে গুনীজনদের হাত দিয়ে । কার লেখা ভালো লেগেছে না বলে আমি এই বিভাগ নিয়ে একটি বিষয় সম্পাদকের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চায় । আর্যদা বা দেবব্রতদা এনাদের কবিতায় কমেন্ট করবো এমন স্পর্ধা আমার নেই তবে এনাদের কবিতা আমি বা আমারা অনেকেই এই গ্রপে বহুপূর্বে পড়েছি আবারও পড়লাম ছাপার অক্ষরে । আমার বক্তব্যও ঠিক এখানেই । শুধু এনাদের কেন তমোঘ্ন চট্টোপাধ্যায় বা কুনাল গোস্বামীর কবিতাও আগে পড়েছি বলেই মনে হয় । যখন একটা পত্রিকা পড়বো সেখানের লেখা যদি অপ্রকাশিত হয় তাহলে সেটার মাধুর্য্য বা চমৎকারিতা পত্রিকাটির পক্ষে মঙ্গলজনক বলেই আমার মত । জানি এটা দেশ বা কৃত্তিবাস নয় তবুও এই ছোট ছোট সবুজপত্রগুলিই বা কম যায় কিসে । হতে পারে এরা বানিজ্যিক নয়, কিন্তু আমার দৃঢ় বিশ্বাস যদি সম্পাদক একটু এব্যাপারে খুঁতখুতে হোন তাহলে আখেরে সবার লাভ । এতে যেমন পাঠকের আগ্রহ বাড়বে তেমনই একদিন বানিজ্যিক স্বার্থও কায়েম হবে । কে বলতে পারে এই পদক্ষেপই আগামীদিনে দেশ বা কৃত্তিবাসের পাশে জায়গা করে নেবেনা ।
এই বিভাগে দেবযানী গাঙ্গুলী, মানবেশ মিদ্দা, স্বদেশ তখন মন্ডল, দিয়া মিত্র, সুমন দিন্ডা, রাজকুমার ঘোষ সহ অনেকের কবিতায় বেশ ভালো লেগেছে ।

পুস্তক আলোচনা তেমনভাবে বুঝিনা, তবে কবিতা বোঝার চেষ্টা করে যায় । মৃগাঙ্ক চক্রবর্তীর কবিতা ও কবি জয়দীপ মৈত্রর কবিতায় বেশ সুখপাঠ্যের রেশ লেগে থাকবে । আলোচকরা নিজ নিজ ভাবে কবিতার আলোচনা করেছেন আর সেখানে আমার কিছু না বলায় শ্রেয় ।

অনুকবিতা সবসময় সুখপাঠ্য । দীর্ঘ কবিতা পড়তে পড়তে একচিলতে হিমেল বাতাসের খোঁজ মেলে অনুকবিতায় । যেভাবে হিমেল হাওয়ায় দুলিয়ে দিলেন কবি মামনি দত্ত তার "হিমেল হাওয়া" কবিতার মাধ্যমে । আর্য্য ঘোষের "পাখনা দাও পিঠে " পড়তে পড়তে সত্যিই মনে হচ্ছিল আকাশে উড়ে খুঁজে নিই মুক্তির পথ । কিন্তু তা আর হলো কই? ঘোর ভাঙলো একটা স্বপ্নের মধ্যে দিয়ে । কল্লোল দত্তগুপ্তের "রোদ আর আদরের খেলায়" নীল ছায়া এসে দাঁড়ালো স্তম্ভিত হয়ে । সেই মহুর্তেই কবি রহিমা খাতুন স্বয়ং খুলে দিলেন "জ্ঞানচক্ষু" । ঠিক মনে হলো একটু আগেই যেখানে নীল আকর্শ স্তম্ভিত হয়ে ছিল সেখানে একপশলা বৃষ্টির দেখা তো মিলবেই যা দিয়ে কবি তার অসামন্য সৃষ্টিতে গড়ে নিতে চাই এক মহাসমুদ্র । যেখানেই সমুদ্র সেখানেই তো অনিকেত প্রেমের দেখা মিলবেই । তারা গোপনে নেমে আসতে চাই কবি বিদর্শী চক্রবর্তীর "কোজাগর" কবিতার উঠোনে । এমন ভাবনা তো কবিকেই মানায় ।
এতকিছু ভালোলাগার মধ্যেও যেন একটু কোথাও কিন্তু কিন্তু থেকে যাচ্ছে । মাথুর দাসের "হালচাল কবিতাটি খুব সুন্দর । ছড়ার ছলে কবি সুন্দর বর্ণনা করেছেন কলি কালের যেমন কর্ম তেমন ফলের । কিন্তু এটা কি আদও অনুকবিতা । আমার যেটুকু দৌড় তাতে এটি পঞ্চপদী বা লিমেরিক বলেই জানি । আমার মনে হয় পঞ্চপদী বা লিমেরিকের জন্য সম্পাদক একটি আলাদা বিভাগ করতেই পারতেন ( যদি সম্ভব হয় ) । কিন্তু অনুকবিতায় লিমেরিক বড় বেমানান লাগছে ।

এতক্ষন যা বকবক করলাম এ নেহাৎই আমার ব্যক্তিগত ধ্যানধারনা । এরসাথে পত্রিকা বা অন্যকারোর কোন সম্পর্ক নেই । কিছু জনের নাম বললাম আর কিছু জনের নিলামনা মানে এই নয় যে তাদের লেখা খারাপ লেগেছে । যে কটি লেখা মনে দাগ কেটেছে আমি তাদের নাম শুধু নিলাম । বাকি সবাই এককথায় অপূর্ব ।

Wednesday, June 26, 2019

সুজাতা বন্দ‍্যোপাধ‍্যায়


গল্প -
                       অন্তরালে

অনন্ত সৃষ্টির পথে মহাকালের সংহার রূপ।জীবনের ছন্দময়তাকে করে প্রতিহত।এমনই এক অনুভব সারা শরীরটায় এক হিমশীতল প্রবাহ ঘটালো সেদিন জীবনে কখনো তোমার কথা ভাবিনি তেমন করে।শুধু তোমার ঐ।সিগারেট ওড়ানো ধোঁয়ার আড়ালে লুকানো মুখটাকে দেখে মনে হতো মুখোশ দেখছি না তো?তামাক পোড়ার গন্ধে ঘরের বাতাস ভারী হয়ে ওঠে।রাজকীয় ছন্দে পুড়তে থাকো তুমি আর তোমার সিগারেট।ধূসর মৃত্যু গুটিসুটি মেরে হামাগুড়ি দিয়ে আসছে দামাল হয়ে, তুমি ভ্রূক্ষেপও করলে না ।ভয়ংকর সে থাবা মারলো তোমার শরীরের অভ‍্যন্তরে -অন্তরালে।তুমি তখনও নির্বিকার।যৌবনের আতিশয্যে, অর্থের আতিথেয়তায় না রূপের অহমিকায় না কেবলই সংসারের পিছুটান না থাকার বৈরাগ‍্যে তা জানি না মৃত্যুকে তুমি ভয় পেতে না কোনদিনই।


আচ্ছা সুবাসদা,তোমার কি মনের মাঝে এতটুকু দুর্ভাবনা হয় না?এতটুকুও অসহায়ত্ব?না পাওয়ার কোন বেদনা?নিজের মনুষ্যত্বের অস্তিত্বের বজায় রাখতে এত পড়াশোনা সফলতা পাওয়ার লড়াই।তবুও তোমার এই জীবন নিয়ে খেলা যেন তোমাকে নেশায় মাতিয়ে রেখেছিল।যোগ্যতার প্রমাণের যে দিন বয়ে গেছে তাকে অবলীলায় পিছনে ফেলে আজকের এই ঝা চকচকে জীবনে তবে কেন ছিল এত অনীহা?নাহ্।কোন উত্তর নেই।বলা ভালো-উত্তর দেওয়ার সেই মানুষটাই আজ নেই।শুধু তার নিস্প্রাণ দেহখানি শেষ শয্যায় শায়িত, শেষ যাত্রার অপেক্ষায়।এই নিঃশব্দে চলে যাওয়া সে তো তোমার জন্য ছিল না।অথচ.....

এক জীবনের পরিসমাপ্তি তার আশেপাশের চিত্রপট বদলে দেয়।শ্মশানযাত্রীরা ফিরে গেছেন যে যার ঘরে।কেবল কাজের জন্য চরনমাসী তখনও রয়ে গেলেন তোমার শূন্য ঘরখানিতে প্রদীপ জ্বালিয়ে রাখার কর্তব্য করতে।দুকাপ লাল চায়ের সঙ্গে একটি ডায়েরি হাতে পেলাম তার কাছে থেকে।পাতা ওল্টাতে ওল্টাতে শেষ পাতায় এসে চমকে উঠলাম।আগের রাতে তোমার শেষ কিছু কথা-"মাত্র তিন মাস আগে খেয়ে সহ‍্য করতে না পারা, ঘনঘন পেটের অসুখে ওষুধে যখন কাজ হচ্ছিল না তখন হাজার খানেক চেকআপ করার পর জানলাম আমি লিভার ক‍্যান্সারের পেশেন্ট।লাস্ট স্টেজ।

ভালোবাসা হীন জীবন মৃত্যুর নামান্তর।আমার কাছে তখন বাঁচা না বাঁচা দুই সমান।যন্ত্রণা সহ‍্য করতে পারছিলাম না।গেলাম ডাক্তার বন্ধুর কাছে।প্রেসক্রিপশন দেখিয়ে বললাম, আমার তো সব শেষ।খুব সহজ কোন মৃত্যুর উপায় বলে দে।ধমকাল খুব।"

-আমি ডাক্তার।জীবন দেওয়াটাই আমার কাজ।

-এই দ‍্যাখ, আমি হাত জোড় করছি তোকে।গলায় দড়ি দেওয়ার ক্ষমতা আমার শরীরে আছে।একমুঠো বিষ বা ঘুমের ওষুধও খেতে পারি।কিন্তু ঐ মৃত্যু আমার মনঃপুত হচ্ছে না।একটু নিশ্চিন্তে, সহজভাবে যদি মরতে পারতাম!

-চুপ করবি তুই?বিমান ডাক্তারী চোখে নয় বন্ধুত্বের চোখে তাকাল আমার দিকে।দু চোখ ওর জলে ভরা।খসখস করে দু পাতা প্রেসক্রিপশন লিখে দিয়ে বলল,সুগার কম করার জন্য ইনসুলিন আর যন্ত্রণা কম করার জন্য ঘুমের ওষুধ দিলাম। ইনজেকশন করতে প্রথম প্রথম আমার কম্পাউন্ডার যাবে ইনজেকশন দিতে।তুই ওর কাছে শিখে নিলেই নিজেই পারবি ।

"মিটিমিটি হেসে উঠে এলাম।পেয়ে গেলাম আমার মুক্তির পথ।"

আর্যতীর্থ



 
কবিতা-
                          । সংখ্যাগুরু।

দেখো হে, এটা নামেই ভদ্রলোকের খেলা, ভেতরে ভীষণ যুদ্ধ
মাঠের ভেতরে পাত্তা পাবে না শান্তির দূত যিশু বা বুদ্ধ।
পিচটাকে ঠিক বানাবো এমন, বল পড়লেই  ঘূর্ণি ঘুরবে
ঠিকঠাক শুধু বল করা চাই, উইকেট  প্রতি ওভারে  উড়বে।
এমনিতে বেশ খাতিরেই রেখো, সংখ্যায় ওরা এমন কি বেশী
খেলার মাঠটা আমাদের জমি, ওরা তো নেহাত অতিথি বিদেশী।
ওদের দেশেতে আমরা থাকলে, পিচটা ওদের মতই বানাবে
আমাদের যারা পাকা খেলোয়াড়, তাদের ওপর অস্ত্র শানাবে।
এবারে পেয়েছি ব্যাটাদের বাগে, মুখে মুখে সব সুবিধাই দেবো
খেলতে নামিয়ে আমাদের পিচে ভূমিপুত্রের সুবিধাটা নেবো।
এরকমই চলে এসব খেলাতে ,সবাই সমান কেন হতে যাবে
সংখ্যাগুরুরা যে কোনো ভাবেই একটু আধটু সুবিধা তো পাবে!
খেলতে দিচ্ছি এটাই তো ঢের, সেটাও কেমন দিই হাসিমুখে
সমর্থকেরা প্রবল চেঁচিয়ে হারার ভয়টা পুঁতে দিক বুকে।
আম্পায়াররা বিচার করবে লিখেছে যেমন খেলার আইনে
ধরা পরে যাবো বেকুবের মত কারচুপি হলে বলের শাইনে।
অন্য সবার চোখে ধুলো দিয়ে দিব্যি সাজবো আইনরক্ষক
ব্যবস্থাপনায় পাবেনাকো  ত্রুটি ,  দেখুক না এসে পর্যবেক্ষক।
তার চেয়ে দেখো তৈরী রেখেছি নিজের মতন পিচ ঘাস ছেঁটে
এবার লঘুরা দেখাও তো বাছা টিঁকবে কজন এই উইকেটে।
পিচটাই হল আসল লড়াই, পিচ গড়ে দেয় খেলাটার ভিত
আমাদের মত পিচটা করেছি,এবারে ওদের হার নিশ্চিত।